Wednesday- September 08,2010
|
|
ড. মোঃ রওশন কামাল - 2009-12-27
যানজটের ঢাকা না ঢাকায় যানজট। আসলে অর্থ একই। তবে মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে নিজের এক দূর অতীতের কথা না বলে থাকতে পারছি না। ১৯৯৪ সালে শ্রীলঙ্কা সরকারের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দৰিণ প্রদেশের শিল্প উন্নয়ন উপদেষ্টা হয়ে যেতে হয়েছিল। সেসময় ঢাকা থেকে কলম্বো যাওয়ার সরাসরি কোন ব্যবস্থ ছিল না এবং এখনও নেই। তাই থাইল্যান্ডের ব্যাংককের পথ হয়ে কলম্বো যেতে হয়। যাওয়ার আগে ‘ট্রাভেল এজেন্ট’ জানাল ব্যাংককের যানজটের কথা। ৩-৪ ঘণ্টার জন্য রাস্তায় ঝুলে থাকা তখন একটা সাধারণ ব্যাপার ছিল। ভয় পেলাম সময়মতো বিমানবন্দরে পৌঁছতে পারব তো? ট্রাভেল এজেন্টকে (একরাত হোটেলে থাকার ব্যবস্থা টিকিটের সঙ্গেই ছিল) তাই তাকে বিমানবন্দরের কাছের কোন হোটেলে থাকার ব্যবস্থা করতে বললাম। ফল হল এই যে থাকতে হল এক নির্জন এলাকার হোটেলে। এখানেই শুনতে পেলাম (সত্য-মিথ্যা জানি না, তবে মন্দ লাগল না) ব্যাংককের রাস্তায় এই ৩-৪ ঘণ্টার যানজটের জন্য সেখানে এক নতুন ও অভাবনীয় পণ্যের আগমন ঘটেছে আর তা হল ‘মোবাইল টয়লেট’। অর্থাৎ ৩-৪ ঘণ্টা রাস্তায় গাড়িতে বন্ধ থাকলেও প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়ার এর চেয়ে ভালো বিকল্প আর কি হতে পারে। বর্তমানে এখানে অর্থাৎ ব্যাংককে কয়েক স্তরবিশিষ্ট সড়ক এবং তার সঙ্গে আকাশ রেলপথও আছে। এই করে তারা যানজট দূর করেছে। গাড়ি কমিয়ে জট কমানো না বরং তেলের খরচ কমানোর উদাহরণ একমাত্র ইসরাইলেই দেখা যায়, তাতে একা থাকলে অন্যকে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে নিজের আর একটি অভিজ্ঞতার কথা বলে নেই। ১৯৮৬ সালে মালেশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে, জাকার্তায় বিশ্ব উৎপাদনশীল কংগ্রেসের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কংগ্রেস শেষে সিঙ্গাপুর হয়ে বিশ্ব উৎপাদনশীল সম্মেলনে যোগ দিতে যাই। আশ্চর্যের ব্যাপার হল সেসময় সেখানে বাড়িঘর, দোকানপাট তৈরি তেমন একটা চোখে পড়ল না, কিন্তু দেখলাম একের পর এক রাস্তা হচ্ছে আর পরবর্তীকালে সেখানে গিয়ে দেখলাম রাস্তার রকমফের দেখে, তলার পর তলা রাস্তা আরও দেখলাম টোলওয়ালা রাস্তায় যাতে গাড়িকে অপেক্ষা করতে না হয় তার জন্য গাড়ির সামনে মোবাইল ফোনের মতো একটা যন্ত্র লাগানো আছে নাম ‘স্মাট ট্যাগ’ তা থেকে সরাসরি টোল দেয়া হয়ে যায়। এটাকেই বলা যায় ডিজিটাল রাস্তা ব্যবস্থাপনা। আমরা কি করব? ডিজিটাল বাংলাদেশের জন্য সবাই ল্যাপটপ কাঁধে ঝুলিয়ে চলব কি? কাজ কি হবে জানি না। এ প্রসঙ্গে এ বছরের আর একটা অভিজ্ঞতার কথা বলা যায়, যা আমাদের আগামীতে কাজে লাগতে পারে। বিশেষ এক আলোচনা সভায় অতিথি হয়ে গিয়েছিলাম ইন্দোনেশিয়ার আগের রাজধানী যোগজার্কাতায়। জার্কাতা থেকে যোগজার্কাতায় বিমানের সময় লাগে ৫৫ মিনিট কিন্তু ভাড়া মাত্র ৯ ডলার। ভাবতে পারেন কেমন করে তা সম্ভব? যাক যা বলতে চাই তা হল রাস্তায় মাত্র ২টা লেন প্রথমটা আমাদের রিকশা লেনের মতো আলাদা করা, কেবল মোটরসাইকেলের জন্য আর বড় অংশ হচ্ছে কার ও বাসের জন্য। রাস্তায় ট্রাফিক চিহ্ন আছে বলে মনে হয়নি আর পুলিশও চোখে পড়েনি। এই ফাঁকে বলে নেই ১৯৮৬ সালে জাকর্তায় কি দেখেছি। রিকশা আছে তবে বড় রাস্তায় না, ভেতরে, আর রিকশায় গলিতে যাত্রী বসে সামনে আর চালক পেছনে। লোকে শখ করে রিকশায় চড়ে।
[ Post your review]
এবার নিজ দেশের কথায় আসা যাক। এই তো ক’দিন আগে ঈদের সময় ঘরফেরা মানুষের রাস্তায় যে অবস্থা দেখলাম তাকে যানজট না বলে মহা মহা যানজট; কে নেবে এই অসহনীয় দুরবস্থার দায়দায়িত্ব? ধরা যাক ঢাকা শহরের এখনকার অবস্থা। বলা হয় ব্যাংক ঋণের বদৌলতে রাস্তায় প্রতিদিন নিত্যনতুন গাড়ি নামছে। শুরু হচ্ছে প্রতিদিন রাস্তার জট থেকে মহাজটের। আর এক সমস্যায় ভুগছি আমরা তা হল রাস্তায় যত্রতত্র পরিকল্পনাকারী ভবিষ্যতের কথা ভেবে কমই পরিকল্পনা করেন। আসলে বর্তমান সমস্যা নিয়ে আর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় ব্যস্ত থাকায় ভবিষ্যৎ ভবিষ্যতেই হারিয়ে গেছে। বিশেষ করে ‘শপিংমল’ এবং স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের নব্য ধনীর দুলালদের (বাচ্চা তো বটেই) এত গাড়ি যে রাস্তায় গাড়ি চলাচলের আর জায়গা থাকে না। এর সঙ্গে আর এক জ্বালা ২-৩শ’ মিটার না যেতেই লাল-নীল বাতির খেলা। লাল বাতি জ্বললে তো পেছনে শত গাড়ির জট। সে লাল পেরুলে আর এক লাল। লালের ধাক্কায় বিনা কারণে রাস্তায় যানজট এক নতুন খেলা। দ্বিতীয় অসুবিধা হচ্ছে বাঁ থেকে ডানে অথবা ডান থেকে গাড়ির যাতায়াত। ভিআইপি (এখন অনেক) তাদের যাতায়াতের জন্য আর এক যানজট সমস্যা। এসব সমস্যার কথা কারও মনে পড়ে কিনা জানা যায় না তবে নানা সময় সেমিনার, আলোচনা সভা, টকশো, সবই হয় কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি এবং দিন দিন সমস্যা আরও প্রকট হচ্ছে। অবস্থা এখন এমন যে, ব্যাংককের মতো ‘মোবাইল টয়লেটের’ ব্যবসা শুরুর অপেক্ষায়। এবার আসা যাক আসল সমস্যায়, যা ঢাকা শহর একা নয় অন্যান্য অঞ্চলকেও বিকল করার পথে। ইতোমধ্যে পুলিশ থেকে এক নতুন পদক্ষেপের প্রচারণা শুরু করেছে। অনেক আলোচনা, টকশো এবং পুলিশেরও নানামুখী পদক্ষেপের ফলাফল কিন্তু সেই শূন্যই। নতুনটা হল প্রধান প্রধান (কেউ বলে ভিআইপি সড়ক) সড়কগুলোতে তিন লেন করে সমস্যা সমাধানের এক পদক্ষেপ। ফল কি হয় তা ভবিষ্যৎই বলবে। কিন্তু এ পর্যন- যেসব দেশের অভিজ্ঞতা কিন্তু আমাদের ব্যবস্থাকে তেমন একটা সমর্থন জোগায় না। যে ধরনের ‘ফ্লাইওভার’ দরকার তা তো তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছি। আর এই অপরিহার্য বিষয়টি কি করণীয়? এ প্রসঙ্গে বলে নেয়া ভালো যে ঢাকা শহরে বিশেষ করে ভিআইপি ও মহাসড়কগুলোতে ২-৩ শত গজের মধ্যেই ট্রাফিক সিগনাল আছে এবং এগুলোর আবার একটার সঙ্গে অন্যটার সময়ভিত্তিক সামঞ্জস্য নেই। ফলে কেবল ট্রাফিক সিগনালের জন্যই অসহনীয় যানজট। তাহলে কি বলব ট্রাফিক সিগনালবিহীন রাস্তা ব্যবস্থাপনা হোক? না, ঠিক তা বলছি না। তবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নেয়া যায় : ১. রাস্তায় ট্রাফিক সিগনালের বাঁ-দিকের পথে কোন লাল বাতি জ্বলবে না। গাড়ি সবসময় সামনে চলবে। তার বাঁয়ে যাওয়ার জন্য সবুজ বাতি জ্বলবে এবং বাঁ থেকে রাস্তায় প্রবেশের জন্যও সবুজ বাতি সবসময় জ্বলবে। আর ডানে যাওয়ার কোন ব্যবস্থা না থাকায় সবসময় লাল বাতি জ্বলবে। এতে ট্রাফিক সিগনালের গ্যানজাম থেকে গাড়ি চলাচল রক্ষা পাবে। ২. দু’নম্বরে দেখা যায় যেখানে রাস্তার বাঁক (বাঁয়ে ও ডানে উভয় দিকে) একঝাঁক রিকশা জটলার সৃষ্টি করে। এ থেকে রৰা পাওয়ার জন্য মোড় ও বাঁকগুলো থেকে অপ্রয়োজনীয় রিকশা কিছুটা দূরে রাখতে হবে। সচরাচর দেখা যায়, যেখানে রাস্তার ক্রসিং সেখানেই সমস্যা আর জট। তাই ডাইনে যাওয়ার ফাঁক ফোকর সব (নিতান্ত কয়েকটি স্থান ছাড়া) বন্ধ করতে হবে। তাতে বিরাট যানজট সমস্যা থেকে অনেকাংশে মুক্তি মিলবে। ইতিমধ্যে ডিএমপি থেকে যে তিন লেন প্রথার চালু হয়েছে তা আমাদের এই নিয়মের জন্য বিশেষ সুবিধা এনে দেবে। চালকরা এই বিশেষ, যদিও আগে থেকেই আছে, মানিয়ে নিতে পারলে আমাদের পরামর্শ মতো গাড়ি চালাতে সহজ হবে এবং যানজট কমবে তবে শেষ হবে না। আমার দেখা পৃথিবীর প্রায় ১ ডজন বড় বড় শহরে এই ব্যবস্থা চালু আছে। গাড়ি আছে অসংখ্য কিন্তু সবাই তাল মিলিয়ে চলে এবং তার চেয়ে বড় কথা রাস্তার লেন পরিবর্তন। সিগনাল পরিবর্তনের জন্য পরিমিত সময় না দিয়ে ‘লেন’ বদলানো যায় না। এতেও জটের সৃষ্টি হয়। তবে ভয়টা হচ্ছে এসব ব্যবস্থায় ফাইলের কারণে দুর্নীতিতে না জড়িয়ে পড়ি। মূল বা বড় রাস্তা ছাড়া যেসব সড়ক আছে বিশেষ করে ধানমণ্ডির ভেতরে একগুচ্ছ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এবং শিৰকদের এত বেশি গাড়ি যে রাস্তা প্রায়ই ৩ এমনকি ৪টি গাড়ি ও পাশাপাশি পার্ক করা থাকে। ফলে স্কুল ছুটির সময় সেখানে পায়ে হাঁটা ছাড়া অন্য কোন পথ থাকে না। যে কাজ করলে এই অবস্থার উন্নয়ন করা সম্ভব তা সাহসী হলে(?) এ থেকে পরিত্রাণ সম্ভব। বাচ্চাকে নামিয়ে গাড়ি চলে আসবে এবং স্কুল শেষে আবার বাচ্চা নিয়ে ফেরত আসবে। এতে রাস্তা কিছু সময় ছাড়া ফাঁকা থাকবে। ‘রোড ক্রসিং’ বাঁ থেকে ডানে যত কম করা যায় তত ভালো এবং সেই সঙ্গে কিছু সময় বেশি দিয়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে হলুদ বাতি ব্যবহার করা যায় (উন্নত দেশে এ ব্যবস্থাই চালু আছে)। আসলে গাড়ি বেশি হওয়া দোষের নয়; দোষ হচ্ছে সড়ক ব্যবস্থাপনার। এ প্রসঙ্গে পূর্বেকার একটা কথা মনে পরে যায়। একদিন দুপুরে ছোট ছেলে বাড়ি ফিরেই বলল, (এবং আদেশ করল) বাড়িতে সবসময় ৬০ হাজার টাকা রাখবে। বুঝলাম ৬০ হাজার টাকা রাখতে হবে, তাকে জিজ্ঞাসা করলাম কেন? সে বলল রাস্তায় সে জটে পড়েছিল ঘণ্টাখানেকের মতো আর সেই সঙ্গে একটা অ্যাম্বুলেন্সও ছিল। বললাম তার সঙ্গে ৬০ হাজার টাকার কি সম্পর্ক? সে বলল, ওই রোগী হয়তো হাসপাতালে যাওয়ার আগেই মারা যাবে। তোমার বাসায় ৬০ হাজার টাকা থাকলে আর কিছু না হোক হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেয়া যাবে। এই দৃশ্য প্রায়ই দেখি আর লক্ষ্য করি ট্রাফিক পুলিশ এমনকি সার্জেন্টও জানে না বা চেষ্টা করে না কেমন করে অ্যাম্বুলেন্সকে তাড়াতাড়ি পার করা যায়। আর পথের গাড়ির কথা নাইবা বললাম। কেউ ওই ব্যাপারে সাহায্য করতে চায় না ইংরেজিতে বলে Procrastination সবাই হাল ছেড়ে দিয়ে বসে আছে কে, কখন তার সমস্যার সমাধান করবে। নিজেরা কিছু করতে আগ্রহী নই। আমার মনে হয় এ অবস্থার জন্য সদা তৈরি আছি। দেখা যাক ভবিষ্যৎ কি উপহার দেয়। তবে আমরা যে আইন মতো চলতে পারি (কিছু সময় দিলে) তার উদাহরণ বাসে ওঠার লাইন দেখে। অন্য ব্যাপারে বিশেষ করে রাস্তার যানজট কমাতেও কিছু সময় দিয়ে তাড়াহুড়ো না করলে ভালোই হবে। দেখা যাক আমরা কোন পথে যাই? [ড. মোঃ রওশন কামাল : রেজিস্ট্রার, ইবাইস বিশ্ববিদ্যালয়] Mukto Column
|

